করোনার এই সময়ে এত মৃত্যুর সংবাদ শুনতে আর ভালো লাগছে না

প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০২০

করোনার এই সময়ে এত মৃত্যুর সংবাদ শুনতে আর ভালো লাগছে না

শরীফা বুলবুল।লাকী ইনাম। নাট্যব্যক্তিত্ব। নন্দিত এই নাট্যজন একাধারে অভিনয় শিল্পী, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী এবং নাট্য শিক্ষক। কর্মমুখর অভিনয় জীবনে বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পেয়েছেন ব্যাপক প্রশংসা। এই শিল্পী ১৯৭২ সালে মঞ্চে অভিনয় জীবন শুরু করেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মধ্য দিয়ে। এই দলের হয়ে মঞ্চে তিনি প্রথম অভিনয় করেন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে। তার বিখ্যাত কিছু চরিত্র ছিল শরমার ‘কণা’, নুরুলদিনের সারাজীবনে ‘আম্বিয়া’, বহুব্রীহিতে ‘জনাবা ইশা’, ‘অয়োময়’তে ‘বড় বউ’। গুণী এই অভিনেত্রী যেমনিভাবে টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ তেমনি মঞ্চেও। আশির দশকের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন হুমায়ূন আহমেদের বহুব্রীহি, অয়োময় ও কোথাও কেউ নেইসহ আরো অন্য পরিচালকের অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে। নিজে পরিচালনা করেছেন বেশকিছু ধারাবাহিক নাটক। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন নাগরিক নাট্যাঙ্গনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও। এছাড়া দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে।

একুশে পদকজয়ী এই শিল্পীর করোনাকাল কেমন কাটছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনার এই সময়টাতে কিছুটা সময় বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়টায় আজ এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কাল অন্য অনুষ্ঠান বিশেষ অতিথি এই করে যেত। এছাড়া আমি তো এখন শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান। এর কাজগুলো করতে হচ্ছে। অবশ্য ফাইলপত্র বাসায় আনিয়ে নিয়ে কিছু কাজ করছি। এছাড়া বাড়ির অনেক কাজও নিজেকে করতে হয়। এসব কাজ করেও কিছু বাড়তি সময় থেকে যায়। এছাড়া আমি আর ইনাম প্রচুর পড়াশোনা করি। ইনাম এর মধ্যে দুটো নাটক অনুবাদ করে ফেলেছে। এছাড়া নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামা’য় (এনএনআইডি) অনলাইনে সপ্তাহে আমি দুটো করে ক্লাস নিচ্ছি। এটার জন্য আমার ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগটা হচ্ছে নিয়মিতই। এটা বড় একটা কাজ হয়ে যাচ্ছে। থিয়েটারে নতুন প্রজন্মের ওপরে আমার অনেকগুলো লেখা আছে। সেসব দিয়ে ‘থিয়েটারে নতুন প্রজন্ম’ নামে একটা বই প্রকাশ করব। এর জন্য আরো কিছু আর্টিক্যাল লিখছি। এই সময়ে সেটা নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি প্রচুর গান শুনি। গান শুনে মনটাকে একটু ফ্রেশ রাখার চেষ্টা করছি। মূলত আমি শুনি রবীন্দ্রসংগীতই। রবীন্দ্রসংগীতের প্রচণ্ড ভক্ত। এ মুহূর্তে আমার প্রিয় শিল্পীদের গান শুনছি। বর্ষার ওপর যত রবীন্দ্রসংগীত আছে, সেসব খুঁজে খুঁজে শুনছি। মহাশক্তির কাছে মানুষের যে অসহায়ত্ব, এ নিয়ে যে প্রার্থনাসংগীত, এ গানগুলো শুনতেও বেশ ভালো লাগছে। এছাড়া ইউটিউবেও অনেকের গান শুনছি।

করোনার এই সময়ে এত মৃত্যুর সংবাদ শুনতে আর ভালো লাগছে না।
কি পড়ছেন জানতে চাইলে এই অভিনয় শিল্পী বলেন, আমি তো মুলত নাটকের মানুষ। নাটক ছাড়া অন্য বিষয় খুব একটা পড়া হয় না। আগে যেমন ছোটবেলায় লুকিয়ে উপন্যাস পড়তাম। একটা সময় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়তে পড়তে শেষ করে ফেললাম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প পড়ে শেষ করলাম। ছোটগল্প পড়ার একটা নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। এরপর উপন্যাস পড়তে শুরু করি। কিন্তু এখন আমার নেশা হলো নাটকের বই পড়া। আমার বাড়িতে শেলফজুড়ে নাটকের বই। সেসব বাছাই করে আলাদা করে রেখেছি। খুঁজতে সমস্যা হয় না। তেমনি ইনামের ক্যামেস্ট্রির সব বইয়ের জন্য আলাদা একটা রুম করে ফেলেছি। আর আমারও যত ইকোনোমিক্সের বই আছে তাও আলাদা করে ফেলেছি। দুজনের সাবজেক্টের যত বই আছে সবই আলাদা করে ফেলেছি।
করোনার এই সময়টাতে আপনার চেনা পৃথিবীটার কতটা বদল ঘটেছে বলে মনে করছেন? লাকী ইনাম বলেন, চেনা পৃথিবীটা অনেকটাই বদলে গেছে। আমাদের একটা চেনা রুটিনই ছিল। নানা কর্মকাণ্ড ছিল। বিশেষ করে আমরা যারা শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। আমাদের পরিশিলীত একটা ব্যস্ত জীবন ছিল। অত্যন্ত সৃজনশীল একটা জীবন। সে জীবনটার এখন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার নাটকের সেট রাখার একটা জায়গা আছে। চার-পাঁচ দিন আগে কেন জানি মনে হলো সেটগুলো একটু দেখে আসি। সেখানে গিয়ে নাটকের সেট দেখে চোখে জল এলো। দুটো নাটকের রানিং ছিল, একটা ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’, আরেকটা হচ্ছে নতুন নাটক ‘আকাশে ফুটেছে ফুল’। এই নাটকটা হচ্ছে লেটোর ওপরে। এই নাটকটার মাত্র পাঁচটা শো হয়েছে। এই নাটকের মধ্য দিয়ে আমরা নজরুলকে মঞ্চে আনতাম। নজরুল অল্প বয়সে একটা লেটোর দলে গান গাইতেন। তখন নজরুল যে গানগুলো লিখেছেন অসাধারণ ছিল। তো ওই নাটকের সেট দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। কবে যে আমরা আবার থিয়েটার করতে পারব জানি না। তবে সহসা যে পারব না তা আন্দাজ করতে পারছি। কারণ আমাদের এই শিল্প হচ্ছে গণমানুষেরই শিল্প। আমরা কবে যে গণমানুষের জন্য মঞ্চে কাজ করতে পারব জানি না।
বাংলাদেশ কী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন? তিনি বলেন, কেন নয়! অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াব আমরা। গত বিশ দশকের মহামারিগুলোর ইতিহাস বলে মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরাও ঘুরে দাঁড়াব। তবে সময় লাগবে।