ভেবেছিলাম মানুষ একটু সংযত হবে-মুনমুন আহমেদ, নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক

প্রকাশিত: ২:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

ভেবেছিলাম মানুষ একটু সংযত হবে-মুনমুন আহমেদ, নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক

শরীফা বুলবুল।মুনমুন আহমেদ। নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য পরিচালক হিসেবে খ্যাতিমান। এ ছাড়া তিনি একাধারে দক্ষ পারফর্মার, কোরিওগ্রাফার, নৃত্য নির্দেশক এবং শিক্ষক। এ দেশের অহংকার। নাচের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ কত্থক নৃত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী এই শিল্পী উচ্চাঙ্গ ও উচ্চাঙ্গনির্ভর নৃত্যের পরিবেশন করে থাকেন।

ভেবেছিলাম মানুষ একটু সংযত হবে। ইতিবাচকতার দিকে যাবে। টাকার জন্য মানুষ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভেবেছিলাম মানুষের মধ্যে যে আধিপত্যভাব আছে সেটা একটু কমে যাবে। কিন্তু না, মানুষ আরো দুর্বিচারী হয়ে উঠেছে, এমন ভাব আরো টাকা, আরো ক্ষমতা দখল করতে হবে।

নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদের শিল্পী-জীবনের সূচনা হয়েছিল গান শেখার মাধ্যমে। কৈশোরে তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিতেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগীতগুরু ওস্তাদ আখতার সাদমানীর কাছে। কিন্তু কৈশোরের চঞ্চল স্বভাব, মন বসতো না হারমোনিয়ামে। ওই পথে তিনি আর এগুননি। থিতু হন নাচেই। নাচের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নাটক-চলচ্চিত্রের অভিনয়েও করেন। মুনমুন আহমেদের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ চলচ্চিত্রে।

বরেণ্যে এই শিল্পীর করোনাকাল কেমন কাটছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসায় বসে অনেক কিছু করছি। করোনার শুরুর দিকে বেশ অলস সময় কাটাচ্ছিলাম। ভীষণরকম ডিপ্রেশন আর টেনশনও করছিলাম। তারপরও সিনেমা দেখা, বইপড়াসহ নানা কাজ নিয়ে শুরুর দিকে ব্যস্ত ছিলাম। মনে হচ্ছিল অবসর সময় কাটাই অল্পদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বিষয়টা এরকমই ছিল। কিন্তু যখন পহেলা বৈশাখ চলে এলো তখন একটু নড়ে চড়ে বসলাম। মনে হলো পহেলা বৈশাখে আমরা কতো অনুষ্ঠান, কতো কিছু করতাম। অথচ এবার!

অনন্যাপায় হয়ে তখন বাসায় একটা কালো কাপড় ছিল, সেটা কাটলাম। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে সেলাই কলাম। এরপর ওয়ালে একটা পর্দা বানালাম। রাত তিনটায় মেকাপ করলাম। আমার বোন আমার বাসায় এসেছিল। তাকে নিয়ে রিহর্সাল করলাম। দুজন মিলে যতটুকু মেলানো যায় একরকম ড্রেস পরে ভোর পর্যন্ত রেকর্ডিং করলাম। এরপর পহেলা বৈশাখের সকালে বৈশাখের নাচ ফেসবুকে আপলোড করলাম। এরপর থেকেই বিভিন্ন নাচের কাজ করে যাচ্ছি। নাচ থেকে দূরে আছি এটা ভাবতে চাই না বলে আমি এর মধ্যে প্রার্থনা সংগীত ‘হে খোদা দয়াময়’, তারপর রবীন্দ্রনাথের ‘না বাঁচাবে আমায় তুমি মারলে কেন তবে’ এসব গানের সঙ্গে নাচ করছি।

এর মধ্যে আরও একটা কাজ করছি, শিক্ষাজীবনে দিল্লিতে আমার যত বন্ধু-বান্ধব ছিল তাদের মধ্যে প্রায় ২৮ জনকে ফোন করেছি। তাদের বলেছি, তোমরা আমাকে ‘গঙ্গা-সিন্ধু-নর্মদা’ গানের একেকটা লাইন সবাই ভিডিও করে পাঠিয়ে দাও। তারা পাঠিয়েছিল। তখন নজরুলের জন্মবার্ষিকী ছিল। বন্ধুদের পাঠানো সেসব ভিডিও বাড়িতে বসে এডিটিং শিখে তা এডিট করলাম। সেটা ফেসবুকে আপলোড করলাম। এরপর আমাদের ম্যারেজডে ছিল। এজন্য ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ’ ম্যাচ করে চিলেকোঠায় গিয়ে রেকর্ডিং করলাম। সেসবও ফেসবুকে আপলোড করলাম। এইসব করেই আছি।

নৃত্যের ক্লাস নিচ্ছেন কী না জানতে চাইলে মুনমুন আহমেদ বলেন, হ্যাঁ এরই মধ্যে নৃত্যের ক্লাস শুরু হয়েছে। শুক্র-শনিবারে ক্লাস নিচ্ছি। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বছরব্যাপী কত্থক নৃত্য কর্মশালার প্রতি বুধবারে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছি। অনলাইনে ক্লাস নেওয়ায় আমি কখনও অভ্যস্ত ছিলাম না। চেষ্টা করছি। এর বাইরে আমার নাচের বন্ধু বান্ধবদেরও খোঁজ-খবর নিচ্ছি। যাকে যতটুকু পারছি সহায়তা দেয়ারও চেষ্টা করছি। এখন তো সবাই দুরবস্থার মধ্যে আছে। আমি নিজেও সমস্যায় পড়ে গেছি। কারণ আমার নিজেরও নাচের স্কুলের ভাড়া, বাসার ভাড়া টানতে হচ্ছে।

‘মুনমুনস কিচেন’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট করেছিলাম সেটাও চালু করতে পারছি না। এরও ভাড়া চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে অসম্ভব টেনশনে আছি। তারপরও নিজেকে বাবরবার মোটিভেট করার চেষ্টা করছি। কারণ নতুন প্রজন্ম যেন মনোবল শক্ত রাখতে পারে। তাদের জন্য আমাদের নিজেদের মনোবল অনেক শক্ত রাখতে হয় এবং তাদের বোঝাতে হয় তোমরা ভেঙে পড়ো না। এই দুঃসময় অবশ্যই আমরা পার করবো, ভালো সময়ের দিকে যাবো। হতাশ যেন না হয়। যেভাবে পারি আমাদের টিকে থাকতে হবে। সুস্থ থাকতে হবে।

পড়াশোনা কিছু করছেন কি না জানতে চাইলে এই শিল্পী আরো বলেন, পড়ছি। তবে নৃত্য বিষয়ক বইপত্রের দিকেই আমার আগ্রহটা বেশি। এর মাঝে দিল্লি এবং বেনারসের বন্ধুদের সঙ্গে নাচ নিয়ে ফেসবুক লাইভে আলোচনা করছি বেশ কয়েকবার। এ ছাড়া আগে যেমন শুটিংয়ের জন্য বেরিয়ে যেতাম কিংবা ক্যামেরা নিয়ে বাসায় আসতো। ভিডিও করে নিয়ে যাওয়ার পর ফ্রি হয়ে যেতাম। কিন্তু এখন সবই করতে হচ্ছে। কদিন আগে শাওনের একটা নাটকে অভিনয় করলাম। যেটার স্ক্রিপ্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি নিজে সেলফি মুডে দিয়ে অভিনয় করে পাঠিয়ে দিলাম। সব কিছু করতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি অনেক বেশি কাজ করছি। যেটা আমি আগে করতাম না। যা বাসায় বসে করছি।

চেনা পৃথিবীর কতোটা বদল ঘটেছে বলে মনে করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষের আর বদলটা হলো কই? ভেবেছিলাম মানুষ একটু সংযত হবে। ইতিবাচকতার দিকে যাবে। টাকার জন্য মানুষ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভেবেছিলাম মানুষের মধ্যে যে আধিপত্যভাব আছে সেটা একটু কমে যাবে। কিন্তু না, মানুষ আরো দুর্বিচারী হয়ে উঠেছে, এমন ভাব আরো টাকা, আরো ক্ষমতা দখল করতে হবে। এই আশংকাটা প্রবল হয়ে উঠছে। তারপরও আশাবাদী হতে ইচ্ছে করে। মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের একটা পরিবর্তন আসবে। সবকিছু নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের।