এক সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি-যে নারী ছিলেন দেশের প্রথম ট্র্রাক চালক

প্রকাশিত: ২:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২০

এক সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি-যে নারী ছিলেন দেশের প্রথম ট্র্রাক চালক

বেগম টুয়েন্টিফোর।যুক্তরাষ্ট্রের জিউ জার্সিতে বসবাসরত সংগ্রামী নারী কবি আলেয়া চৌধুরীর জীবনাবসান ঘটেছে। তিনি নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। বাসার ফ্ল্যাট থেকে মঙ্গলবার পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেছে। স্বশিক্ষিত এ কবির প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই ‘জীবনের স্টেশনে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। অন্য বাইয়ের মধ্যে রয়েছে কবিতার বই ‘হার্লেমের নিগ্রো আমি’, ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ প্রভৃতি।

কবি আলেয়া চৌধুরীর জীবন-সংগ্রাম সিনেমা-উপন্যাসকেও হার মানায়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল লিখেছেন, ‘তাঁর সংগ্রামী জীবন নিয়ে আমার একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণের কথা ছিলো। …কাহিনিটা ছিলো একেবার তাঁর জীবন থেকে নেয়া। গল্পকেও হার মানানো জীবনালেখ্য। কুমিল্লার অজপাড়া গাঁ চর্থা গ্রামের এক দুরন্ত গ্রাম্য কিশোরী। গ্রাম্য শালিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে ঘৃণা ছুড়ে নেন অর্থাৎ পাটখড়িতে আগুণ জ্বালিয়ে ছুড়ে মারেন পঞ্চায়েতের তথা ফতোয়াবাজিদের দিকে। সেজন্য তাঁকে ঝাঁড়ু পেটা করা হয়। বাবাও শান্তি স্বরূপ বাড়ির সামনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। রাতে মা সেই বাঁধন মুক্ত করে ছেড়ে দিলেন। বললেন, যা পালিয়ে যা…। ট্রেনে চড়ে চলে এলেন ঢাকায়। শুরু হলো অন্য রকম এক বস্তিজীবন, কুলি-মজুরের জীবন, না-খেয়ে থাকার জীবন। এক ট্রাক ড্রাইভারের দয়া হলো। তাঁকে গ্রহণ করলেন পালক কন্যা হিসেবে। কিছুদিন না যেতেই এক্সিডেন্টে মারা যান সেই আশ্রয়দাতা পিতা। আবার অনিশ্চিত ছন্নছাড়া জীবন, এতিমখানার জীবন, বুয়ার জীবন, ইট ভাঙার কাজ! সংগ্রামী জীবন শুরু করেন রিকশাচালক হিসেবে। তারপর হকার-জীবন। তাঁকে ৫ কপি ফ্রি ইত্তেফাক দেয়া হতো। তা টিকাটুলি থেকে হাঁটতে হাঁটতে এবং পত্রিকা বিতরণ করতে করতে ৩২ ধানমন্ডিতে যেতেন বঙ্গবন্ধুর কাছে পত্রিকা দিতে। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁকে সেলাই মেশিন দিতে চান। তখন তিনি আবেদন করলেন পাবলিক বাস চালানোর জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ট্রাক ড্রাইভার হতে চাইলেন! তা সংবাদ শিরোনাম হলো! এই সবের পাশাপাশি মন খারাপের কথাগুলো, কষ্টগুলো রোলকরা খাতার পাতায় লেখা শুরু করলেন। ছাপা হতে থাকলো কবিতা!। ১৯৭০ সালে বেগম পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। …এলোমেলো জীবনের তাগিদে হঠাৎ একটা ছোট চাকরি হলো ইরান দূতবাসে। কাপড় ইস্ত্রি করা। সেখান থেকে অনেকটা ‘পাচার’ জীবনের মতো চলে যান ইরানে। শুরু হলো আরেক পরবাসী বহিমিয়ান জীবন। সেখান থেকে জার্মানে। জার্মান থেকে যাযাবরের মতো একদিন চড়ে বসলেন মাছ ধরা ট্রলারে। সেই জাহাজ চলতে থাকে অজানার দিকে। এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রচণ্ড শীত, বরফের সাথে জীবন-মরণ লড়াই করে পৌঁছলেন বাহামার এক সৈকতে। সেখান থেকে এক লোক ঊদ্ধার করে স্ত্রীর ভয়ে গ্যারেজে লুকিয়ে রেখে পরদিন শহরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই কাহিনি ভয়াবহ কাহিনী! সেই স্বশিক্ষিত আলেয়া ধীরে ধীরে দাঁড়ালেন নিজের পায়ে। কিন্তু তখন তিনি কিছুটা ক্লান্ত। সেই সাথে শরীরে বাসা বাঁধলো মরণব্যাধি ক্যান্সার। এরই মধ্যে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আর্থিকভাবেও স্বচ্ছল হন। জিউ জার্সিতে একটি ফ্ল্যাট এবং আরেকটি বাড়ি করেন। ঢাকায় সম্ভবত গোড়ানে জমি কিনেন; ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট কিনে ভাই-বোনদের দেন। অবিবাহিত আলেয়ার স্বপ্ন ছিলো একটি সংসারের। কিন্তু তা আর হলো না! এরই মধ্যে প্রকাশ পায় ইংরেজি-বাংলা কবিতা বই। আমি তাঁর একটি বইয়ের প্রকাশক। নিউইয়র্কের বিভিন্ন জনের ফেইসবুকে থেকে জানতে পারলাম, জীবনযুদ্ধে হেরে গেলেন তিনি। আজ বিকেলে আলেয়ার মরদেহ তাঁর বাসভবনের বাথরুম থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে! আমি এই সংগ্রামী কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি!’

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে কবি অসীম সাহা লিখেছেন, ‘আলেয়া চৌধুরী। ডাক নাম হীরা। আমরা যারা ওঁর কাছের ছিলাম, তারা সকলেই ওকে হীরা বলেই ডাকতাম। সেই কিশোরী বয়স থেকে ওকে চিনি। …১০/১২ দিন অগেও কল করেছিল। বলছিল, ‘অসীমদা, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। কখন কী হয়?’ আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম, ‘কিছু হবে না হীরা।’ কিন্তু কিছু হলো। হীরা আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেল। আর কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না, ভাবতেই বুকটায় মোচড় দিয়ে ওঠছে। চোখ থেকে ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না! হীরা, তোমাকে মনে থাকবে বোন!’