‘নারীর চরিত্র হননের চেষ্টা, এটা অপরাধ তো বটেই, সমাজের একটা ব্যাধিও’

প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২০

‘নারীর চরিত্র হননের চেষ্টা, এটা অপরাধ তো বটেই, সমাজের একটা ব্যাধিও’
সাদী মুহাম্মাদ আলোক।সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এই ঘটনার পর পুলিশের দায়ের করা মামলায় সিনহার সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথ ও শাহেদুল ইসলাম সিফাতকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তারা দুই জন জামিনে রয়েছেন।

এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিপ্রা দেবনাথের বেশ কিছু ব্যক্তিগত স্থিরচিত্র ও ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শিপ্রা অভিযোগ করেছেন, তাদের মোবাইল, কম্পিউটার পুলিশ জব্দ করেছিল। জব্দ করা মোবাইল, কম্পিউটার থেকে তাদের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এসেছে কিছু সংখ্যক দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সিনহা হত্যাকাণ্ড ঘিরে শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহীদুল হক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার

শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘আমি তো আসলে ফেসবুক বা ইন্টারনেট, এগুলো কিছু ব্যবহার করি না। কিন্তু, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। আমার মনে হয়, কারো প্রাইভেসি লঙ্ঘন একেবারেই গ্রহণযোগ্য না। তা ছাড়া, এটা তো সেনসেশনাল (স্পর্শকাতর) হত্যা মামলা। সেখানে এই ধরনের তৎপরতা বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। সেই উদ্দেশ্য থেকেই এগুলো করা হচ্ছে। এগুলো খুবই অনৈতিক কাজ। অবশ্যই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থেকে কাজটা করা হয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত করা যায়। অবশ্যই এটাও এক ধরনের অপরাধ।’

কোনো ঘটনার সঙ্গে নারীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা নিয়ে সেই নারীর চরিত্র হননের যে চেষ্টা হয়, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো ঘটনার সঙ্গেই নারীর সংশ্লিষ্টতা থাকলেই এই যে তার প্রতি সন্দেহ প্রবণতা বা তার চরিত্র হননের চেষ্টা, তা অপরাধ তো বটেই, পাশাপাশি আমাদের সমাজের একটা ব্যাধিও। এই যে নারীর চরিত্র হননের একটা চেষ্টা, এর পেছনে যদি কোনো উদ্দেশ্য নাও থেকে থাকে, কিন্তু, নারীর চরিত্রকে যে কলঙ্কিত করে দেখানো, এটাও তো আমাদের নৈতিক স্খলন বা অবক্ষয়ের একটা বহিঃপ্রকাশ। এই কাজগুলো যারা করেন, তারা বিকৃত মানসিকতার।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বা উচিত বলে মনে করেন?, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা কাজটি করেছেন, তাদেরকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় আনা যায়। আজকে এই নারীর (শিপ্রা) জায়গায় যদি কোনো মন্ত্রীর মেয়ে হতো? তাহলে কী হতো? তাহলে তো তাকে ডিজিটাল আইনের আওতায় আনা হতো। এমন উদাহরণও তো আছে। কাজেই শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি যারা প্রকাশ করলেন, তাদেরকে বিদ্যমান আইনে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আইন তো সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত। একজনকে নিন্দা করলে শাস্তি দেওয়া হবে, আরেকজনের ক্ষেত্রে তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করলে কিছুই হবে না, এটা তো হতে পারে না।’

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তাই শিপ্রার ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে দেওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?— প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহীদুল হক বলেন, ‘কে ছড়িয়েছে তা তো বলতে পারব না। কিন্তু, এভাবে একজনের ব্যক্তিগত কোনো কিছু তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় একটা অপরাধ। যারা এই কাজ করেছে, তাদের যদি শনাক্ত করা যায়, তাহলে তারা তো আইনের মধ্যে পড়বে। কেউ তো আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সবার তো একটা প্রাইভেসি আছে। সেটা যাতে নষ্ট না হয়, আইনে এর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’

শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে তার চরিত্র হননের যে চেষ্টা, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিনহার সঙ্গে তো ঘটনাস্থলে ছিলেন সিফাত। শিপ্রা ছিলেন না। তাই এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শিপ্রার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে আমি মনে করি। শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দিয়ে কী লাভ হবে? যারা করছে তাদের কী লাভ হবে এতে? আমি মনে করি এর মাধ্যমে কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না। শাক দিয়ে তো মাছ ঢাকা যাবে না। যেটা সত্য তা উদঘাটিত হবেই। নিরপেক্ষ ও বিধিসম্মত তদন্ত হলে সত্য উদঘাটিত হবে। সত্য উদঘাটিত হলে যারা এই মৃত্যুর সঙ্গে দায়ী থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘যেহেতু ডিজিটালি ছবিগুলো প্রকাশ করা হয়েছে, তাই যারা কাজটা করেছে, তাদের শনাক্ত করা গেলে এই আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর আগে, কারা কাজটা করেছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে’, যোগ করেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘একটা খুব বিখ্যাত প্রবাদ সেদিন পড়েছি। অনেকদিন যাবত নারীকে ক্ষমতায়িত করার প্রশিক্ষণ চলছে। কিন্তু, ক্ষমতায়িত নারীর সঙ্গে কেমন করে চলতে হয়, সেই প্রশিক্ষণটা পুরুষকে দেওয়া হয়নি। সিনহার ঘটনার এক ধাপ আগে যদি আমরা যাই, কিছুদিন আগে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকে ‘বিতর্কিত নারী’ বলে উল্লেখ করতে দেখলাম। তারপর দেখুন ডা. সাবরিনা। তার অপরাধকে ছাপিয়ে তিনি দেখতে সুন্দর নাকি সুন্দর না, কতটা লাস্যময়ী, এ নিয়ে আমরা কথা শুরু করে দিলাম। আমাদের সমাজে আগের জেনারেশনে বা এখনকার জেনারেশনে পারিবারিক আবহে মা বা বোনকে সম্মান করার বিষয়টি ছিল। এখন তো সমাজের সব জায়গায় এত ইনটলারেন্স (অসহ্যতা) যে সবকিছুকেই আমরা ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নেই। কোনোটাকেই জাতীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের সমস্যা রাখি না। সবসময় ব্যক্তিগত আক্রমণ করি।’

‘দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই ব্যক্তিগত আক্রমণটা আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও দেখি। দেখবেন, অপহরণ হলে একটা পরকীয়ার ঘটনা বের হয়। যখন সাগর-রুনি মারা গেলেন, রুনির একটা পরকীয়ার কথা বের করা হলো। কিন্তু, ওই পরকীয়ার লোকটাকে আমরা খুঁজে পেলাম না। তাহলে সেই লোকটা গেল কোথায়? বা রুনিকে হত্যার সঙ্গে এটার কী সম্পর্ক? ডা. সাবরিনার অপরাধের সঙ্গে সৌন্দর্যের কী সম্পর্ক? আজকে সিনহা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শিপ্রার ব্যক্তিগত জীবনের কী সম্পর্ক? এটা হচ্ছে নারীর প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতায়িত নারীকে দেখতে যে আমরা একটা জেনারেশনকে প্রস্তুত করছি না, সেটার বহিঃপ্রকাশ’, বলেন তিনি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এখানে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় স্বার্থ দেখার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের লোকদের ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কাজেই ব্যক্তিগত আক্রমণের জায়গাটা তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা হিসেবে মনে করে।’

যারা শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করেছেন, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন তো দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু একটা দিলে এমনিতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ধরার পর নির্লজ্জের মতো আবার বলে, সরকারবিরোধিতার কারণে তাকে ধরে নেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারবিরোধিতা করা যাবে না? তাহলে আমরা গণতান্ত্রিক, এটা কেন বলা হয়? সেখানে কে সরকারের বিরোধিতা করল সেটা যদি বের করা যায়, তাহলে শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি কে দিলো, তা বের করা যাবে না? একজন মানুষের চরিত্র হননের যে চেষ্টা হচ্ছে, এখন আমি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ দেখতে চাই। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই যখন একজন নারীর চরিত্র হনন করা হচ্ছে, প্যানেল কোড অনুযায়ীও তো এটা একটা অপরাধ।’

‘শুধু সরকারবিরোধিতা করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ করব, আর যখন একটা প্রকৃত বড় জাতীয় পর্যায়ের অপরাধকে ঢাকতে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনাচরণকে নিয়ে আসা হয়, তখন আমি কেন প্যানেল কোড ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করি না? কাজেই এগুলো তো হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্রই তো শেখাচ্ছে আমাদেরকে যে বানিয়ে দাও ওর নামে একটা চরিত্র হননের গল্প। তাহলেই মানুষ আর অপহরণের বিচার চাইবে না, হত্যার বিচার চাইবে না। প্রকৃত অপরাধের বিচার যাতে মানুষ না চাইতে পারে, সেজন্য মানুষের মনোযোগকে ডাইভার্ট (স্থানান্তরিত) করা হয়। কারা করছে? পুলিশ করছে, সরকার করছে। তাহলে আমরা বিচারের জন্য কার কাছে যাব?’, যোগ করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

আর্কাইভ

December 2020
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031