করোনাকালের কাহিনি।।সৈয়দা আফরোজা

প্রকাশিত: ৫:১৯ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২০

করোনাকালের কাহিনি।।সৈয়দা আফরোজা

আমার মেয়েটি আজ প্রায় দুই মাস হতে চলল ঘরবন্দি হয়ে আছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে, সেখানে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে সে এখন মাস্টার্স করছে। অনেক দিন পর এবার ওর কাছে গিয়ে দেড় মাসের মতো থেকে এলাম। আসার আগের দিন ও মিউ মিউ করে বলেছিল আরো কয়েকটা দিন ওর সঙ্গে থেকে যেতে। ওর বাবা মেয়ের চাওয়াকে না করে না কখনো, কিন্তু এবারে তিনি আর রাজি হলেন না। একটু অবাক হলাম তার অনাগ্রহ দেখে, অন্যদিকে আমারও কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল; তাই দেশে ফিরে এলাম ২৮ ফেব্রুয়ারিতে। ঢাকায় বিমানবন্দরে নেমেই শুনলাম আমার বড় দুলাভাই মারা গেছেন আমি রওনা দেওয়ার আগের দিন। আর এ জন্যই মেয়ে চাইলেও তার বাবা এবার আর আমার আমেরিকা থাকার সময় বাড়াতে রাজি হননি।

আমার কাছে অনেকের দাবি থাকে তাদের একুশের বইমেলায় নিয়ে যাওয়া ও বই কিনে দেওয়া। হাতে মাত্র এক দিন ২৯ তারিখ (লিপইয়ার), আমার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল দিনটি। একসময় একুশের বইমেলায় যেতাম নিজের প্রাণের টানে, এরপর যেতাম মেয়েকে নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাওয়ার পর আমার মেয়ে তার চোখের পানি আটকাতে পারেনি। প্রতিবছর বইমেলায় যাওয়ার তার যে অদম্য উত্সাহ আর আকর্ষণ ছিল তা যেন একেবার উবে গেল হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর, বইয়ের পোকার বই পড়ার আগ্রহও যেন নিভে গেল। পরে আমিই তাকে জোর করে নিয়ে যেতাম। এরপর তো পড়তে চলে গেল সুদূর সেই মার্কিন মুল্লুকে। ওখানে যাওয়ার পর কোনো ফেব্রুয়ারিতেই দেশে না থাকায় পর পর গত চারটি বইমেলায় তার আর যাওয়া হয়নি। আমি যাই বোন, ননদ-দেবরের ছেলে-মেয়েসহ ওদের ও অন্যদের জন্য বই কিনতে। তো কেউ কাছে না থাকায় এবার ২৯ ফেব্রুয়ারিতে ওদের বাদ দিয়েই গেলাম। তবে অন্যবারের মতো তালিকা না করায় মন ভরে কেনাও হলো না।

২৬ তারিখ সকালে আসার দিন মেয়ে বলছিল শরীর ভালো লাগছে না, কিন্তু তখন কিছু করার ছিল না। দোহা পৌঁছেই শুনলাম ওর জ্বর এসেছে, আমাদের এক ভাই এসে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে, ওষুধ চলছে। ওখানে তো তখন করোনা শুরু হয়ে গেছে। মনের যে কি অবস্থা! বারবার মনে হচ্ছিল কেন এলাম! প্রতিটি দিন যে কি দুর্বিষহ কেটেছে! সানি ওর বউ বৃষ্টি আর বোন অ্যানি ওই সময় আমার মেয়েকে যে সহযোগিতা করেছে তার তুলনা হয় না; ওরা সর্বক্ষণ খোঁজ রেখেছে, ওষুধ, খাবার, জুস ও প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে গেছে। বোস্টন থেকে আমার ছোট বোনও সব সময় খবর রেখেছে। ওরা ওকে টাকাও পাঠিয়ে দিচ্ছে।

মন মানে না, আমি আবারও যেতে চাইলাম, কিন্তু ও না করল। ওর জ্বর ছিল স্বাভাবিক জ্বর, সে সুস্থ, তাই বলল আমি যেন দেশে থেকে তার বাবাকে বরং দেখেশুনে রাখি। কারণ সে জানে তার বাবা একজন কাজপাগল লোক, দায়িত্ব পালনের সময় ঘর-সংসার বা নিজের কোনো সুযোগ-সুবিধার কথা তার মাথায় থাকে না মোটেও।

এরপর আজ প্রায় দুই মাস হতে চলল মেয়েটি আমার ঘরবন্দি অবস্থায় আছে। নিউ ইয়র্কে ও যেখান থাকে সেখানকার অবস্থা মোটেও ভালো না। মেয়েটি আমার ভালোবাসে অবারিত নীল আকাশ, ঝকঝকে রোদেলা দিন, স্রোতস্বিনী নদী, সুনীল পানির সমুদ্র আর সবুজ প্রকৃতি। সুর্যাস্ত দেখা তার কাছে প্রিয় খাবারের থেকেও বেশি। প্রতিদিন সে সেন্ট্রাল পার্কে ঘুরবে, হাডসন নদীর পার ধরে হাঁটবে, বরফের সময় বরফের সৌন্দর্য দেখার জন্য বাইরে বেরিয়ে পড়ে। না হলে তার শরীর-মন কিছুই ভালো লাগে না। শীতের শুরুতে গাছের সবুজ পাতা যখন কমলা লাল হয়ে ওঠে তখনকার ওই ‘ফল কালার’ দেখার ও এর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সে বেরিয়ে পড়ে নানা দিকে।

প্রকৃতির মাঝে একাকার হয়ে থাকা মেয়েটি আমার এখন ভয়েই যায় না নদীর পারে, হাওয়া খায় না পার্কে গিয়ে। কিন্তু বাইরে বের হওয়ার জন্য তার মন আঁকুপাঁকু করে, ছটফট করে, যখন তখন ফোন করে। আমরা বলি, তোমার না অনেক রাত, ঘুমাওনি? জবাব দেয়—আমি তো বন্দি, বন্দির আবার দিন-রাত কী? আমার কখন দিন হয় আর কখন রাত হয় তা আমি বুঝি না, ঘুম হয় না; মনে হয় এভাবে থাকলে মানসিক রোগী হয়ে যাব।

অনলাইনে ক্লাস হয় বলে কিছুটা সময় ওদিকে দিতে পারে। কিন্তু এভাবে ক্লাসও ভালো লাগে না তার, মাঝেমধ্যে বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে অনলাইনে আড্ডা দেয়, গ্রুপ ওয়ার্ক করে, ব্যায়াম করে, বই পড়ে, মুভি দেখে, টিভি দেখে। এতে আর কত সময় কাটে! খাওয়াদাওয়া নিয়েও সমস্যা। সানিরা প্রতি সপ্তাহে রান্না করা খাবার দিয়ে যায়, নিজে যা পারে করে। এতে তার পেট ভরে, মন ভরে না। সে তো খেতে ভালোবাসে যা তা এখন পাচ্ছে না। সামারেও ক্লাস হবে, দেশে আসতে পারবে না বলেও মেজাজ আরো খারাপ থাকে।
নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে—ঘুম হচ্ছে না একদম। এভাবে দিনের পর দিন ঘরে বন্দি থাকলে ঘুম তো আর কাছে আসে না!

দেশে নিজ বাসায় আছি, রান্না করছি; অথচ মেয়েটি ওখানে কত কষ্টই যে করছে খাওয়া নিয়ে! মেয়ের প্রিয় খাবারগুলো অবশ্য কমই রান্না হয় বাসায়। কবে করোনার প্রকোপ কমবে, কবে বিমান চলবে, চললেও কবে যেতে পারব বা সে আসতে পারবে—এসব নানা চিন্তা নিয়ে অনিশ্চিত এক সময়ের মধ্য দিয়ে চলছে আমাদের জীবন।

মেয়ে যখন বলে—বাবা-মা আমি তোমাদের কবে দেখব? আমার কি আর কখনো তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না; তখন ওর বাবার চোখ দিয়ে নীরবে পানি গডায়, মুখে বলে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে! আমি? আমার তো কান্না আসে না, বুকের বাম পাশে ব্যথা করে অব্যক্ত যন্ত্রণায়! সে তো আমার অনেক কষ্টের সন্তান, একটি মাত্র সন্তান! আমার অনুভূতি বোঝানোর কোনো লিখিত ভাষা নেই। শুধু অপেক্ষার দিন গোনা—কবে চলবে বিমান! কবে উড়ে যাব আমরা মেয়ের কাছে!

 

 

 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব 

আর্কাইভ

April 2021
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930