আনুশকা হত্যা, সমাজ যখন বিচারক

প্রকাশিত: ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২১

আনুশকা হত্যা, সমাজ যখন বিচারক

হুমায়রা নাজিব নদী।।

একমাত্র বাংলাদেশিদের মধ্যেই একটা টেন্ডেন্সি দেখলাম যে কোনো অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পরে অপরাধির পক্ষে কথা বলার জন্য একপাল জঘন্য নরকের কীট দাঁড়িয়ে যায়। শুধু দাঁড়িয়ে যায়না। রীতিমতো কনফিডেন্স নিয়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনকি ইউটিউব পর্যন্ত চলে আসে অপরাধির পক্ষে সাফাই গাইতে।আমার হিসেবে ভুলও থাকতে পারে। হয়তো পুরো এশিয়ান সাবকন্টিনেন্টেই এই চিত্র দৃশ্যমান।কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে, আর সেখানে ভিকটিম যদি নারী হয় তো কথাই নেই। তাঁকে বেশ্যা বানানোর জন্য উঠে পরে লাগে যায় একদল অমানুষ ।আনুশকা ইংলিশ মিডিয়ামের স্টুডেন্ট ছিলো। সতেরো বছরের একটা মেয়ে গ্রুপ স্টাডি করতে গিয়েছিলো ছেলে বন্ধুর বাসায়। ঘটনাটা খুবই স্বাভাবিক। আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ স্টাডি করছি, তখন অনেকবার সিনিয়র ভাইয়াদের বাসায় গিয়েছি গ্রুপ স্টাডি করতে। এখানে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেই। অস্বাভাবিক যেই ব্যাপারটা ঘটেছে, তা হচ্ছে মেয়েটা লেখাপড়া করতে যেয়ে তারই সহপাঠী দ্বারা রেপ্ড এবং মার্ডার্ড হয়েছে।একটা মেয়ে গোপনাঙ্গ থেকে প্রচন্ড রক্তক্ষরনে মারা গেছে, তাঁর ফরসেনিক রিপোর্ট তাই বলছে। ধর্ষক নিজে যেখানে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে , তারপরও সমাজের কিছু বিবেকবর্জিত দু পায়ে ভর দেয়া পশুদের কাছে ওই মেয়েটারই দোষ। এই একে অন্যকে দোষারোপের নগ্ন খেলায় যেসব পুরুষ এই জঘন্য মনোভাব দেখায়, ধর্ষকের পক্ষে কথা বলে, ধর্ষিতার পোশাককে অজুহাত বানায়, তাদেরকে বলা হয় পটেনশিয়াল ধর্ষক। এদের মাঝে ধর্ষকামিতা প্রচ্ছন্ন বা স্পষ্ট ভাবে বিদ্যমান, তাই নারীকে এদের কাছে ভোগের বস্তুই মনে হবে চিরকাল । আর ধর্ষককে মনে হবে হিরো। গোপনাঙ্গের কেশ গজানো শুরু হতেই এদের রেগুলার ভার্চুয়াল পার্টনার থাকে সানি লিওন কিংবা মিয়া খলিফার মতো পর্ণ স্টাররা। এইসব পুরুষের উদ্যেশ্যে বলবো, একজন নারীর বাহুযুগল বা মাথার চুল কিংবা জাস্ট কন্ঠ শুনেই যদি উত্তেজিত হয়ে থাকো, তাহলে তোমাদের জায়গা স্রেফ জঙ্গলে। আর যদি একান্তই সমাজে বসবাস করতে হয়, তবে তোমাদের উচিত জাহেলিয়া যুগের দাসদের
মতো নিজেকে খাশি করে ফেলা।নারীদেরকে পোষাক সম্পৃক্ত উপদেশ না দিয়ে নিজেরাই খাশি হয়ে যাও ! সেটাই তোমাদের জন্য কারেক্ট এ্যাকশান। এই গেলো ইনিয়ে বিনিয়ে ধর্ষকের পক্ষ নেয়া পুরুষদের কথা। কিন্তু যেসব নারীরা ধর্ষকের পক্ষ নেয়, তাদেরকে আসলে কি বলা উচিত ? এর আগে মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলো তাঁরই শিক্ষক এবং সহপাঠীরা। পরবর্তীতে উঠে এসেছে নুসরাতের হত্যাকারী পুরুষ শিক্ষক এবং ছেলে সহপাঠীদের সবাই তাঁর এ্যাডমায়ারার ছিলো, ব্যাপারটা একতরফা হওয়ায় ব্যর্থ হয়ে প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু ওই ঘটনায় সরাসরি হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিলো কিছু মহিলা সহপাঠী, যাদের পরিচয় ছিলো নুসরাতের বান্ধবী।অর্থাত জীবদ্দশায় কোনো রকম শত্রুতা তাদের সাথে নুসরাতের ছিলোনা। আহারে নারী ! এইসব নারীদের আমার কাছে ধর্ষকের চেয়েও ভয়ংকর মনে হয়। ধর্ষক নামক পিচাশের এ্যাটাকের পেছনে কারন থাকে তাঁর লোভ লালসা। কিন্তু সেই নরপিচাশ ধর্ষকদের ডিরেক্টলি অথবা ইনডিরেক্টলি মদত দেয়ার জন্য এইসব নারীদের কোনো কারন লাগেনা। আমার হাজবেন্ড সবসময় একটা কথা বলেন। তোমার খুব ক্লোজ একজন ছেলেবন্ধু তোমার এ্যাবসেন্সে তোমাকে ডাউন দিবেনা। কিন্তু তোমার মেয়ে বান্ধবী, সে যতই ক্লোজ হোকনা কেনো, তোমার এ্যাবসেন্সে সে তোমাকে ডাউন দিবে। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন তাঁর ছেলে মেয়ে উভয় জেন্ডারের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে, হয়ত তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে সে কথাটা বলে। যাই হোক, আমি একজন নারী হিসেবে নারীদেরকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করি তখন। আমি আসলেই মনে প্রানে বিশ্বাস করি সব নারী এমন না। কিন্তু সেই সাথে স্বীকার করতেই হচ্ছে বিবেকহীনতা কিংবা প্রচন্ডভাবে ঘৃনা করার ক্ষমতায় কিছু নারীর জুড়ি মেলা ভার। কোনোরকম লিংক, পূর্বশত্রুতা বা কারন ছাড়া এইসব নারীরা একজনকে ঘৃনা করতে পারে, স্রেফ হিংসা এবং হীনমন্যতা বশত। কিছুক্ষন আগে ইউটিউবে দেখলাম আনুশকা নামের সতেরো বছর বয়সী যে মেয়েটা রেপ্ড হয়েছে, তাকে বেশ্যা বানানোর ঘৃন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারই বয়সী আরেকটা মেয়ে। রেপিস্টদের পক্ষে অনর্গল অশুদ্ধ ক্ষ্যাত বাংলা ভাষায় বকবক করে যাচ্ছে ইউটিউব চ্যানেলে এসে। তাঁর বাচনভঙ্গিই বলে দিচ্ছে সে কোন লেভেল থেকে এসেছে। সমস্যা হচ্ছে আজকাল যোগ্য লোকের পাশাপাশি অযোগ্য লোকের হাতেও ইউটিউব চ্যানেল। কথা বলবার কোনো ধরন নাই, ছিরিছাম নাই যে যা ইচ্ছা ইউটিউবে এসে ঠুস করে বলে দিচ্ছে। সেরকমই একজন লোয়ার লেভেলের নারী ইউটিউবারকে দেখলাম প্রমান করার চেষ্টা করছে রক্তক্ষরনে মরে যাওয়া মেয়েটা একটা বেশ্যা ছিলো। আসল সমস্যাটা কোথায় জানেন ? আনুশকা ছিলো ধনী পরিবারের ইংলিশ মিডিয়ামের মেয়ে। একই বয়সী যে মেয়েটা ইউটিউবে এসে তাঁকে বেশ্যা প্রমাণ করতে চাইছে, তাঁর যোগ্যতা, স্ট্যাটাস কিংবা লেভেল আনুশকার ধারের কাছেও নাই। তাই শুধুমাত্র হিংসা আর হীনমন্যতায় সে নিজে একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন ধর্ষিত মৃত মেয়ে সম্পর্কে এইভাবে বলছে। আর নির্লজ্জের নিকৃষ্টের মতো ধর্ষক দিহানের পক্ষে কথা বলছে।
যখন কোনো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা শিশুকে বলাৎকার করা হয়, তখন অনেকেই চুপ থাকেন। আর কেও ভয়েজ রেইজ করলে চুপ থাকা লোক গুলো তাকে নাস্তিক বলে ঘোষনা করে। যাকে নাস্তিক বলা হচ্ছে, সে কি ধর্মের বিপক্ষে বলছে? নাকি ধর্মের তখমা ব্যবহারকারী সেই বিকৃত যৌনাচারীর বিরুদ্ধে কথা বলছে? কাওকে নাস্তিক বলার আগে একবার বিষয়টা বিবেচনায় রাখবেন। সেই সাথে মনে রাখবেন, চুপ থেকে বা ভয়েজ রেইজারদের দমিয়ে দিয়ে আপনেও পরোক্ষভাবে শিশু নির্যাতনে অংশ নিচ্ছেন।আমাদের সমাজের বিবেক কবে যে জাগ্রত হবে কে জানে! যে সমাজ অপরাধির পক্ষে সাফাই গায়, পুরুষরা নিজের বিকৃত পারভার্ট মনোভাবকে জাস্টিফাই করতে, আর নারীরা হিংসা ও হীনমন্যতাবশত, সে সমাজের কাছে আর যাই হোক, সুবিচার আশা করা যায়না।

 

 

আর্কাইভ

April 2021
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930