ভিন্নমতাবলন্বীদের প্রতি বিরুপতা

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১

ভিন্নমতাবলন্বীদের প্রতি বিরুপতা

হুমায়রা নাজিব নদী ।

 

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার.. এই আদর্শে আমি কোনো দিনই একমত হতে পারিনা। প্লিজ, আমার স্ট্যাটাসের প্রথম লাইনটা পড়ে হুট করে জাজমেন্টাল হয়ে যাবেন না কেও। হয় পুরাটা পড়বেন, আদারওয়াইজ ইগনোর ইট। আসলে এই পর্যন্ত যতো হাঙ্গামা বা অনাকাঙ্খিত কীর্তি কাহিনী বাংলাদেশে ধর্মের ইস্যুতে ঘটেছে, সেগুলোর অনেক গুলোর পেছনেই এই একত্ববাদ ধারনা হাঙ্গামাকারীদের জন্য একটা বিশেষ সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে। কিছুদিন আগে কুমিল্লার এক দুর্গা পুজা মন্ডপে কতিপয় সন্ত্রাসী ঢুকে এবং এ্যাজ ইউজুয়াল মুর্তি ভাঙচুর করে পুরা অনুষ্ঠান পন্ড করে দেয়। তাদের অভিযোগ ছিলো পবিত্র কোরআনকে মূর্তির পায়ের নিচে রেখেছিলো হিন্দুরা।হিন্দুদের দাবি কাজটা ইনটেনশনালি তাদেরকে ফাসানোর উদ্যেশ্যে করা হয়েছে। যারা মুর্তি ভাঙচুর করেছিলো, তারা নিঃসন্দেহে কোনো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কেও হবেনা। কাজটা করেছিলো মুসলমান নাম ভাঙ্গানো সন্ত্রাসীরা। ওই পুজা মন্ডপ এরিয়াতে যদি রেস্ট্রিকশান দেয়া থাকতো যে সেখানে কেবল হিন্দুরাই থাকবে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ নিষেধ, তাহলে এই সিন ক্রিয়েশানের সুযোগই থাকতোনা। হিন্দুদেরও তাদের বিরুদ্ধে ষরযন্ত্রের সুযোগ থাকতোনা। একটা ভয়ংকর সত্য হচ্ছে, শত্রু কখনোই দূর থেকে ক্ষতি করতে পারেনা। ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে তাকে অবশ্যই কাছে যেতে হবে। আর অন্তত উৎসবের ক্ষেত্রে এই একত্ববাদ ধারনা সুযোগসন্ধানীদের পাশবিক মনোকামনা চরিতার্থের একটা মোক্ষম সুযোগ। এবার আসছি হিন্দুদের কথায়। অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজনকে আমি কোরবানীর সময়ে এ্যাডভাইস দিতে শুনেছি, কোরবানীর টাকাটা বিপদের দিনে দান করে দিতে। ইনফ্যাক্ট আমিও সেটাই করেছি গত কোরবানীতে। আমার নিজের বিবেকবোধ থেকে আমি কাজটা করেছি। কিন্তু অনেক মুসলিম মনে প্রাণে বিশ্বাস করে কোরবানীর অর্থ কোরবানী না দিয়ে অন্য খাতে ব্যয় সমীচীন না। সেক্ষেত্রে অন্য ধর্মের লোকজন অযাচিত উপদেশ দিলে গায়ে জ্বালা হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এক্ষেত্রে একটু চুপ থাকাটাই কি বান্চনীয় না? আপনাদের দীপাবলীতেও হাজার হাজার দীপ ঘি’র মতো এক্সপেন্সিভ দাহ্য দিয়ে জ্বালিয়ে উৎসব যাপন করেন। এক্ষেত্রে ঘি দিয়ে এতো দীপ জ্বালিয়ে টাকা খরচ না করে সেই টাকা গরীব দুঃখীকে দান করার এ্যাডভাইসটা আমার কাছে নিছক অনধিকারচর্চাই মনে হয়। আপনাদের বিশ্বাসে আপনারা দীপ জ্বালান, মুসলিমদের কেও তাদের বিশ্বাসে কোরবানী দিতে দিন। কয়েকদিন আগে এক দিদিকে দেখলাম এরকম কোরবানী সংক্রান্ত উপদেশ দিতে গিয়ে মারাত্নক গালাগালি খেলো। এসব গালির ধরন দেখে একজন মুসলমান হিসেবে নিজেই মাটিতে মিশে গিয়েছিলাম। এরকম আগ বাড়ানো উপদেশ দিতে না আসলে তো দিদি এমন তোপের মুখে পরতেন না। তাই একত্ববাদ মুখোশ ধরে আরেকজনের উপাসনালয়ে ঢুকে ত্রাস সৃস্টিরও দরকার নাই, আর মানবিকতার মুখোশ ধরে আরেক ধর্মের নিয়মকানুনে নাক গলিয়ে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করাও অনুচিত। যার ধর্ম তাঁরই থাকবে।উৎসবের ক্ষেত্রেও নিজস্বতা বজায় থাকবে। আমরা একে অপরকে রেসপেক্ট শো করবো।

 

 

সেদিন একটা নিউজে দেখলাম নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষন, অপমান ইত্যাদির প্রতিবাদে এবছর কলকাতা থেকে একটু দূরে অবস্থিত বহরমপুরের স্বর্গধাম ক্লাবের ৭৫ তম এ্যানিভারসারিতে তাদের পুজা মন্ডব সমস্ত নারী জাতির সন্মানে উৎসর্গ করে করেছে। যে নারী সৃস্টি করে, সে বিনাশের ইতিও ঘটাতে পারে। যার একহাতে মঙ্গলতার বারতা, অন্য হাতে সে অমঙ্গল নাশের ক্ষমতা রাখে। নারীদের উপর অত্যাচারকে ‘না’ বলার বার্তা তারা মানবজাতির কাছে পোঁছে দিয়েছে এবছর দুর্গোৎসবে।কি ভিষন এ্যাপ্রিসিয়েট করার মতো একটা উদ্যোগ, তাইনা? শ্রদ্ধা জানাই এই বোদ্ধাদের, যাদের কাছে ধর্মের মানে স্রেফ পাথরের মুর্তি বসিয়ে পুজা করা না, বরং ধর্মের অর্থ তাদের কাছে মানবতার কল্যান কামনা। নিজের ধর্মের আচার, বিশ্বাস, নিয়মকানুন, বিধিনিষেধ মেনেও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা যায়। তাদের ভালো উদ্যোগ গুলোকে এ্যাপ্রিসিয়েট করা যায়।অন্য ধর্মাবলম্বীদের শুভকামনা জানানো যায়।

 

নিজস্বতায় অটল থেকেও ভিন্ন মতাদর্শকে রেসপেক্ট করা যায়। একজন সাংবাদিক আছেন (শফিক রেহমান), উনার একটা কথা আমাকে সবসময় নাড়া দেয়। “পক্ষপাত অন্যায় নয়, কিন্তু নিরপেক্ষতার আবরণে পক্ষপাতিত্ব দুষ্টের কাজ”
আর আমার কাছে ধর্মীয় সংস্কৃতি বা উৎসবের ক্ষেত্রে ঐক্যবাদ হচ্ছে এই দুষ্ট চক্রকে গন্ডোগোল তৈরির সুযোগ করে দেয়া। কোরানের একটা আয়াত আমার ভীষন ফেভারিট
Lakum deenukum waliya deen
~Surah Al Kaferun [109]
( For you is your religion and for me is my religion)
তাই আমার কাছে ধর্ম যার যার, উৎসবও যার তাঁর তাঁর, প্রতিটি ধর্মে জেগে থাকুক মানবতার অজুহাত।
সেটাই মঙ্গল, সেটাই শান্তি