নিখিলের মেরুদণ্ড ছিল, তাই ভেঙেছে

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২০

নিখিলের মেরুদণ্ড ছিল, তাই ভেঙেছে

অনামিকা আহমেদ।আমেরিকার জর্জ ফ্লয়েড আর আমাদের নিখিল তালুকদার— আমার কাছে একাকার হয়ে আছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লেখালেখি দেখে বুঝতে পারছি আমার মতোই বাংলাদেশের আরো অনেকের কাছে ঘটনা দুটি একই রকমের বেদনার জন্ম দিয়েছে। তবু নিখিল তালুকদারকে নিয়ে কোথাও কোনো শব্দটিও নেই আর। খোদ গোপালগঞ্জে যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম সেখানকার কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীলে পুলিশি নির্যাতনে নিখিল তালুকদারের মৃত্যু হয়েছে।

শুনেছি ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর সারাদেশে যখন সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছিল তখন কোটালীপাড়ার এই রামশীল ছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ফ্লয়েড আর নিখিল দুজনই বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার। নিখিল পেশায় কৃষক এবং ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু। অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় অত্যন্ত দরিদ্র। যে শামীমের নির্যাতনে নিখিল মারা গেলেন, তিনি পুলিশের একজন এএসআই, আইন প্রয়োগকারী, ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি। নইলে তাস খেলা এমন কোনো অপরাধ নয় যে একটা মানুষের মেরুদণ্ড তিন টুকরো করে দিতে হবে! বাস্তবে তাই করা হয়েছে।

জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনায় সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগুন জ্বলেছে। পুরো বিশ্বে যখন আলোচিত হচ্ছিল মার্কিন পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাটি, ঠিক তখন বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় নিখিল তালুকদার পুলিশের নির্যাতনে প্রাণ হারালেন। জর্জ ফ্লয়েড যখন খুন হন তখন সেখানে ঘটনাচক্রে ১৭ বছরের তরুণী ডারনেলা ফ্রেজিয়ার উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি থেকে জানতে পাই, যখন ডারনেলা ভিডিও ক্যামেরা চালু করেন তখন ৪৬ বছর বয়স্ক জর্জ ফ্লয়েড দম নিতে না পেরে হাঁপাচ্ছেন, ফ্লয়েড যে তিনটি শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, তা এখন বিশ্বজোড়া আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে। ‘আই কান্ট ব্রিদ’—’আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’, জর্জ ফ্লয়েড কোনো মতে বলেছিলেন শব্দ কয়েকটি। কথাগুলো কিছুটা অস্পষ্ট ছিল।

ডারনেলা ফ্রেজিয়ার তার নয় বছরের এক কাজিন বোনকে নিয়ে দোকানে যাচ্ছিলেন। দোকানটা মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে, ডারনেলাদের বাসার বেশ কাছে। পথে তিনি দেখতে পান পুলিশ কীভাবে ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরেছে। তিনি দাঁড়িয়ে যান। তার ফোন বার করেন এবং রেকর্ড বোতামে চাপ দেন। পুরো দশ মিনিট নয় সেকেন্ড তিনি ভিডিওতে ছবি তোলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ অফিসাররা ফ্লয়েডকে সেখান থেকে সরিয়ে না নেয়। পুলিশ অফিসাররা পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায় এবং ফ্লয়েডকে নিয়ে যাওয়া হয় স্ট্রেচারে করে।

জর্জ ফ্লয়েড হত্যার খুঁটিনাটি বিশ্বজোড়া সবার জানা আছে। নিখিলের কথা আমরা দেশের মানুষই জানি না। গত ২ জুনের ঘটনা এটি। রামশীল ব্রিজের পূর্বপাশে বসে তাস খেলছিলেন নিখিল তালুকদার ও তার সঙ্গীরা। কোটালীপাড়া থানার এএসআই শামীম উদ্দিন দুই সঙ্গী নিয়ে সেখানে যান।

গোপনে মুঠোফোনে নিখিলদের তাস খেলার দৃশ্য ধারণ করেন। বিষয়টি টের পেয়ে খেলা রেখে দৌঁড়ে পালনোর চেষ্টা করেন নিখিলরা। অন্য তিন জন পালিয়ে যেতে পারলেও নিখিলকে এএসআই শামীম ধরে ফেলেন। মারপিটের এক পর্যায়ে হাঁটু দিয়ে নিখিলের মেরুদণ্ডে আঘাত করেন শামীম। এতে নিখিলের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। পরে হাসপাতালে মারা যান তিনি।

নিখিলের মেরুদণ্ড যখন তিন টুকরো করে দিলেন এএসআই শামীম তখন কোনো ডারনেলা ফ্রেজিয়ার সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। থাকলে হয়তো আমরা একটা ভিডিও পেতাম। হয়তো আমাদের ঘুমিয়ে থাকা বিবেক জাগত। জর্জ ফ্লয়েডের শেষ কয়েক সেকেন্ডের ওই ভিডিও যা ডারনেলা তার ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন, তার প্রতিক্রিয়াও অনেক অসুস্থ করে তুলেছিল ১৭ বছরের মেয়েটিকে। প্রশংসিত যেমন হয়েছেন। সমালোচিতও হয়েছেন, যেমন ডারনেলা ফ্রেজিয়ার ‘বাহাদুরি’ দেখাতে ওই ভিডিও তুলেছিলেন, ফ্লয়েডের মৃত্যু ঠেকাতে কিছুই করেননি বলা হয়েছে।

ডারনেলা অবশ্য এতে দমে যাননি, যেমন গিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারবিজয়ী কেভিন কার্টার। যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত সুদানে শকুনের মুখের সামনে এক শিশুর ছবি তুলে আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কেভিন। কেন তিনি শিশুটিকে রক্ষার চেষ্টা করেননি, বারবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে শেষপর্যন্ত আত্মদহনে আত্মহত্যা করেছিলেন।

ডারনেলা অবশ্য ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। মারমুখি মার্কন পুলিশের হাত থেকে ফ্লয়েডকে রক্ষা করতে গেলে নিজেই যে নির্যাতিত হতেন, এ নিয়ে সংশয়ের সুযোগ নেই। বরং ভিডিও ধারণ করে বর্ণবাদবিরোধী ছাইচাপা আন্দালন উসকে দিয়েছেন। ডারনেলা নিজেও সেটা জানেন বলে উত্তরে লিখেছেন, ‘আমি ভিডিও না তুললে ওই চারজন পুলিশ এখনো তাদের দায়িত্বে বহাল থাকত, অন্যদের জন্য সমস্যা তৈরি করত। এই ভিডিও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে, তারা জেনেছে কী ঘটেছিল।’

আমেরিকা প্রবাসী পশ্চিমবঙ্গের লেখক ড. পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘সেই ভিডিওর শক্তি এমনই যা এখন সারা আমেরিকায় এবং বলতে গেলে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্র, শাসকশ্রেণি, এবং তার পুলিশের বর্ণবিদ্বেষ, নিপীড়ন এবং প্রতিদিনের নির্মম হত্যার জীবন্ত মানবিক দলিল। তার ভিত্তিতেই উত্তাল জনরোষ, এবং এই করোনাভাইরাস সংকট উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক জনআন্দোলন। এই নাগরিক সাংবাদিকতা, নতুন প্রজন্মের বিবেক এবং সাহসকে অত্যাচারী শাসকশ্রেণি ভয় পায়। এখন ডারনেলা এবং তার মা আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ তাদের এখন জীবনের আশঙ্কা। ডারনেলা এই ঘটনার সাক্ষী থেকে এবং এই হত্যা প্রত্যক্ষ করে ট্রমার শিকার। আমরা চাইবো, দেশে দেশে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যেন এই মেয়েটির কথা সবাইকে বলে, এবং তার মতো সাহসী নাগরিক সাংবাদিকতার আশ্রয় নিয়ে শাসকশ্রেণীর হিংসা, নিপীড়ন এবং দুর্নীতি ফাঁস করে দেয়।’

ধরা যাক, জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ভিডিওটির মতো একটা ভিডিও পেয়ে গেলাম নিখিল হত্যার। অথবা অন্য কোনো নাগরিক সাংবাদিক এমন একটা ভিডিও প্রকাশ্যে নিয়ে এলেন। তাহলেও একজন হিন্দু-কৃষক হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামতাম কিনা সন্দেহ আছে আমার। কেউ কেউ, খুবই সামান্য সংখ্যক মানুষ সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ করছেন। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বাকি মানুষেরা কোথায়?

এক পুলিশের অপরাধে আমেরিকার অন্য পুলিশরা আন্দোলনকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানিয়েছে। তামিকা ম্যালরি বলে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনকারীর একটা বক্তব্য আমাকে ভীষণ আলোড়িত করেছে। একটি ভিডিওতে দেখলাম তামিকা বলছেন, ‘আমাদের সঙ্গে লুটপাট নিয়ে কথা বলতে এসো না। তোমরা সবাই লুটেরা। আমেরিকা কালো মানুষদের লুটপাট করছে। নেটিভ আমেরিকানদের লুটপাট করেছে।’ তামিকা নিজেও একজন মার্কিন নাগরিক। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। তিনি যখন বলেন, ‘আমেরিকা কালো মানুষদের লুটপাট করছে’ তখন অন্য একটা আমেরিকার অস্তিত্ব দেখতে পাই আমরা, যে আমেরিকা আঙ্কেল স্যামের আমেরিকা নয়, কালো মানুষের আমেরিকা।

আঙ্কেল স্যাম যুক্তরাষ্ট্রে দেশপ্রেমের একটি প্রতীকী চরিত্র। বলা হয়, আমেরিকার যুদ্ধের সময় তিনি দেশের জন্য ‘তোমরা এসো, মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দাও’ বলে মানুষকে আহবান জানিয়েছিলেন। এই কাহিনির সত্যতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমেরিকায় ১৩ সেপ্টেম্বর ‘স্যাম ডে’ পালন করা হয়। ধরা হয় এটা স্যাম চাচার জন্মদিন। স্যামের যে ছবি আঁকা হয়, তাতে সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীকী রংগুলো বিদ্যমান থাকে যেমন লাল, সাদা আর নীল এবং মাথায় থাকে তিন তারকা সংবলিত হ্যাট। স্যাম আমেরিকানদের কাছে দেশপ্রেমের প্রতীক। কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে যুদ্ধবাজ আমেরিকানদের বোঝায়। আমেরিকায় তামিকাদের মতো যেসব কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক স্বাধীন দেশেও অবহেলা, অবজ্ঞা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তাদের কাছেও কি আঙ্কেল স্যাম একই অর্থ বহন করে?

সেই ১৯৬৮ সালে রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং হত্যার পর যে বিশাল আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, এবার আরও একবার জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে তার প্রতিচ্ছবি দেখা গেল। কিন্তু বাংলাদেশে কী হয়? বাংলাদেশে নিখিলরা খুন হলে নিরবে শেষ হয়ে যায় ঘটনার। বিশেষত সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের বিচার পাওয়া কঠিন। প্রতিবাদও ঠিকমতো হয় না। নিখিল হত্যায় আমরা বেশিরভাগ নাগরিক তাই নিশ্চুপ। আমরা কোনো প্রতিবাদে নেই। অথচ আমাদের উচিত মেরুদণ্ড সোজা করে প্রতিবাদ জানানো।

আসলে নিখিলের মেরুদণ্ড ছিল, তাই ভেঙেছে। আমরা তো সব সরীসৃপ। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতেই পারি না বেশির ভাগ সময়।

 

 

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী