খ্যাতির বিড়ম্বনা

প্রকাশিত: ১২:২১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২১

খ্যাতির বিড়ম্বনা

হুমায়রা নাজিব নদী

 

মাঝে মধ্যে মনে হয় খুব সাধাসিধে গোছের সাধারন মানুষ অথবা সাধারন বাবা মায়ের সন্তান হতে পারাটা বোধহয় প্রতিটা মানুষের জন্য ব্লেসিং। মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কিং খানের কথাই ধরি। রিসেন্টলি এই বলিউড বাদশার আদরের শাহজাদা আরিয়ান খান ড্রাগ কনসাম্পসনের অভিযোগে আটক হয়েছে।আরিয়ান যদি খুব সাধারন পরিবারের, লোকের মুখে মুখে নাম না জানা কোনো বাবার ছেলে হতো, তখন হয়তবা অপরাধি হিসেবে কেবল তাঁর নামটাই জনসমূখে উঠে আসতো। বাবা কে সে নিয়ে এতো মাতামাতি হতনা। কিন্তু সে যেনোতেনো কোন বাবার ছেলে না। একেবারে টপ লেভেলের সেলিব্রিটির পুত্র। তাই সহজাত নিয়মে সবার আগে বাবার নামটাই উঠে আসছে। পাবলিক ফিগার বলে কথা।

শাহরুখ বরাবরই আমার প্রিয় অভিনেতা।একজন সেল্ফমেড ম্যান হিসেবে তাঁর প্রতি রেসপেক্টের স্থানটা আমার মনে একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু এই ঘটনায় আমার যতখানি না খারাপ লাগছে প্রিয় অভিনেতার জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ লাগছে একজন অসহায় বাবার জন্য, যিনি তিলে তিলে শুন্য থেকে শুরু করে আজকের অবস্থান তৈরি করেছেন, যে বাবা ছেলের কারনে কেবল গর্বিত হওয়ারই যোগ্যতা রাখেন, অথচ গর্বিত হওয়ার বদলে সন্তানের কারনে তাঁর কপালে আজকে শুধুই হেনস্তা। মিডিয়া গুলোর নিশানা তাঁর দিকে তাক করা.. ওই যে সুপারস্টার শাহরুখ খান, যার ছেলে মাদকগ্রহনের অভিযোগে গ্রেফতার। আহারে ফেম ! জীবনভর অগণিত ভক্তের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। আবার বৈরি কিছু ঘটলে একমুহূর্তে তাঁর দিকেই আঙুল তাক করা। জনপ্রিয় ব্যাক্তিটার পরিবারের কেও কোনো দোষ করলেও সেই কালো অধ্যায় বর্ণনায় তাঁর নামই উচ্চারিত হয় বারবার।

সেইদিন আমাদের দেশের এক সময়কালের পর্দা কাঁপানো টপ লেভেলের জনৈকা অভিনেত্রীর একটা সাক্ষাতকার পড়লাম। উনি যদিও আমার পছন্দের শিল্পীদের তালিকায় নেই। কিন্তু নিউজফিডে তাঁর সাক্ষাতকারের উপরের শিরোনামটা দেখে কৌতুহলবশত নিউজটা পড়ে ফেললাম। সাক্ষাতকারের এক পর্যায়ে অভিনেত্রী বললেন ‘রিয়েল লাইফে আমরা খুব দুঃখী, কিন্তু সেই দুঃখটা সবার সাথে ভাগ করে নেয়া যায় না’… পুরো সাক্ষাতকারের এই একটা লাইনের ভেতরে জীবনভর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। না প্রকাশ করা অনেক কষ্ট, অনেক অভিমান, গভীর একাকিত্বের সুর যেনো মিলে মিশে একাকার ছিলো এই একটা কথার ভেতরে। একজন সেলিব্রিটির জন্যে না, বরং নিজে একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর জন্য সমবেদনা অনুভব করলাম। আমাদের দেশের নারীরা এমনিতেই নিরাপত্তাহীন। তার ওপর যদি হয় সে সেলিব্রিটি, তবে প্রতিদিন তাকে নিয়ে করা প্রতিটা নিউজের কমেন্ট বক্সে সে ধর্ষিত হয় লক্ষ থেকে কোটিবার।

প্রায়াত এক সিনিয়ার অভিনেত্রী জীবদ্দশায় তাঁর শেষ ইন্টারভিউতে নিজের জীবনের একাকিত্ব নিয়ে অনেক হতাশা প্রকাশ করে গেছেন। একাধিক সন্তানের কেওই মৃত্যুকালে উপস্থিত ছিলোনা। নিঃসঙ্গ জীবনে শেষ দিকটায় তিনি একাই পার করেছেন হাহাকারপুর্ন জীবন। পাশাপাশি বসে একটু গল্প করা, একসাথে বসে এককাপ চা খাওয়ার মতো লোকটা তাঁর পাশে ছিলোনা। জীবনের শেষ সাক্ষাতকারে তিনি এই না পাওয়ার হা হুতাশ গুলো প্রকাশ করে গেছেন। অথচ একটা সময় এই অভিনেত্রী তাঁর মিস্টি হাসি দিয়ে ভুবন ভুলিয়ে রাখতেন।এই ব্যাপার গুলো দেখার পরে জানার পরে আমার কাছে ফেম বা খ্যাতি ব্যাপারটাকে রঙিন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোন মনে হয়। আছে তো আছে, হাওয়ায় মিশে গেলে কিছুই অবশিষ্ট নেই। কখনো কখনো এই খ্যাতি মানুষকে এতোটাই একা করে দেয়, সেই একাকিত্ব না যায় কারোর সাথে ভাগ করে নেয়া, না যায় জীবনের পথে বয়ে চলা।